গাজীপুর প্রেসক্লাবকে সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি স্বৈরাচারী শক্তির দোসরদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজীপুর। বিতর্কিত কয়েকজন সাংবাদিকের বিচারের দাবিতে বুধবার গাজীপুর প্রেসক্লাব ও বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সংস্থাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম সংগঠনের সাংবাদিকরা যৌথভাবে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে জেলার বিভিন্ন স্তরের সাংবাদিক নেতারা সংহতি প্রকাশ করে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ করে এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তথ্য উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর একটি লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপি ও মানববন্ধনে বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, বিগত ১৬ বছর ধরে গাজীপুর প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে থাকা কতিপয় ব্যক্তি ক্লাবটিকে অঘোষিতভাবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কার্যালয়ে রূপান্তর করেছিলেন। পেশাদারিত্ব ও সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি বিসর্জন দিয়ে তারা ক্লাবের ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন, মৃত্যু দিবস, ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন, শেখ রাসেলের জন্মদিনসহ বিভিন্ন দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, দলবেঁধে টুঙ্গিপাড়ায় মাজার জিয়ারতের নামে এই পেশাজীবী সংগঠন থেকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও সাবেক মেয়রের তোষামোদি এবং অপসাংবাদিকতার আড়ালে এই চক্রটি বিপুল অর্থ-সম্পদ ও অবৈধ সুবিধা হাসিল করেছে বলে মানববন্ধনে জোর দাবি করা হয়।
উপস্থিত সাংবাদিকরা আরও উল্লেখ করেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর পেশাদার সাংবাদিকদের আন্দোলনের মুখে ক্লাবের বিতর্কিত কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি ‘তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী’ গঠন করা হয়েছিল। তবে অতি সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে যে, ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা পুনরায় ক্লাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সাংবাদিক নেতারা জানান, ক্লাবের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে গত ২৯ জুন সাবেক কমিটির নেতারা একটি অবৈধ সভা আহ্বান করেন, যেখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিত থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

বিক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, গত ৩০ জুন প্রেসক্লাবের হলরুমে আয়োজিত একটি ফল উৎসবে সাবেক সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর ও সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা শওকত ওসমানকে প্রধান অতিথি করা হয়। একই সাথে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নিষিদ্ধ সংগঠনের এক নেতা, যা সাধারণ ও পেশাদার সাংবাদিকদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করেছে। মানববন্ধন থেকে সাংবাদিকরা ‘গর্জে উঠুক প্রতিবাদ, নিপাত যাক ফ্যাসিবাদ, নিরাপদ হোক গাজীপুর প্রেসক্লাব’ এবং ‘গাজীপুর প্রেসক্লাবকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করতে হবে’ সহ বিভিন্ন স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। তারা অনতিবিলম্বে বিতর্কিত সাবেক এসপি হারুন-অর-রশীদ এবং সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের ক্লাব থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও বিচারের দাবি জানান।
নেতৃবৃন্দ প্রশাসনকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সদস্যপদ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সাধারণ সদস্যরা আগামীতে আরও কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন।
বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সংস্থার সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিকের সভাপতিত্বে এবং মাজহারুল ইসলাম কাঞ্চনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গাজীপুর প্রেসক্লাবের তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য দেলোয়ার হোসেন, সদস্য ফারদিন ফেরদৌস, প্রেসক্লাব সদস্য মোহাম্মদ আাসাদুজ্জামান, অধ্যাপক আবুল হোসেন চৌধুরী, খোরশেদ আলম, অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, হাফিজুর রহমান, মনির সরকার, মনজুরুল হক গাজী ও গোলাম রসুল দিনার প্রমুখ। এছাড়া গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গাজীপুর প্রেসক্লাবকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার সাংবাদিকদের একটি নিরাপদ সংগঠনে পরিণত করার জোর দাবি জানান।